ল্যাটকা খিচুড়ির স্বাদে মাতোয়ারা কারওয়ান বাজার
ঢাকার কারওয়ান বাজার মানেই ব্যস্ততা, কর্মচাঞ্চল্য আর হাজারো মানুষের আনাগোনা। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মব্যস্ততার মাঝেই কিছু খাবারের দোকান নিজেদের স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছে। তেমনই একটি দোকানের জনপ্রিয়তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ল্যাটকা খিচুড়ি।
হ্যাঁ কথা বলছি হাইপে থাকা কারওয়ান বাজারের "শাহী মোঘল বিরিয়ানী" এর ল্যাটকা খিচুড়ির। প্রতিদিন সকাল গড়াতেই খিচুড়ির বড় বড় ডেকচি থেকে ভেসে আসে সুগন্ধ। সকাল ১০টার পর থেকেই শুরু হয় ক্রেতাদের ভিড়। কেউ দোকানে বসে সকালের নাশতা সারেন, আবার অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যান এই জনপ্রিয় খাবার।
এই ল্যাটকা খিচুড়ির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর স্বতন্ত্র স্বাদ ও পরিবেশনের বৈচিত্র্য। ক্রেতাদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ ডিম দেওয়া ল্যাটকা খিচুড়ি। এর মূল ডিশ কিন্তু মোটা ভাতের চালের সাথে ডাল, আলু, গাজর, শাকপাতা দিয়ে নানান মশলা সহযোগে রান্না করা পাতলা খিচুড়ি। সাশ্রয়ী দাম এবং পুষ্টিগুণের কারণে এটি শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে অফিসগামী কর্মজীবীদের কাছেও সমান জনপ্রিয়। তবে সাধারণ খিচুড়ির পাশাপাশি মুরগির মাংস, গরুর মাংস কিংবা খাসির মাংসের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় এই খাবার। এই পদগুলো মূলত পোলাওয়ের সাথে বিক্রয় এর জন্য রান্না করা।
দোকান সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খিচুড়ি রান্না করা হয়। দিনের চাহিদা মেটাতে ৭০ থেকে ৮০ কেজি চাল ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে খিচুড়ির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। আকাশ মেঘলা থাকলে কিংবা বৃষ্টির দিনে গরম গরম খিচুড়ির প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন দোকানে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
খাবারের মান ও স্বাদের পাশাপাশি মূল্যও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। ডিম দেওয়া এক প্লেট ল্যাটকা খিচুড়ি তুলনামূলক কম খরচেই পাওয়া যায়। আর যাঁরা একটু ভিন্ন স্বাদ খুঁজছেন, তাঁরা গরু, খাসি কিংবা অন্যান্য মাংসের সংযোজনও বেছে নিতে পারেন। ফলে বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য এখানে রয়েছে পছন্দমতো খাবার গ্রহণের সুযোগ। চাইলে ভুনা খিচুড়িও চেখে দেখতে পারেন। কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশন এর ঠিক পাশে গ্রীণ রোডের দিকে একটা গলি চলে গিয়েছে (সিএ ভবনের বিপরীত পাশে "কুয়াকারস ৭" এর ঠিক পরেই এই দোকানের অবস্থান।
আজ দুপুরে একটা কাজে কারওয়ান বাজার হয়ে যাওয়ার সময় ঢুঁ মারলাম অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে তালিকায় থাকা এই দোকানে। কারওয়ান বাজার মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করে হেঁটে মিনিট পাঁচেক এর মধ্যে চলে গেলাম সেখানে। এসির শীতল পরিবেশে ফাঁকাই ছিলো, সম্মুখের একটি টেবিলে বসে মেন্যুতে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম পাতলা খিচুড়ির মূল আইটেম মোটা ভাতের চালের পাতলা সবজি খিচুড়ি আর সাথে সিদ্ধ ডিমের কারি। কারণ, মুরগী, গরু, খাসি; সবকয়টির সাথেই খিচুড়ি-ডিমের কারি কমন রয়েছে। তাই মৌলিক স্বাদ নিতে ডিমের কারি'র ল্যাটকা খিচুড়িই নিলাম। পরিমিত মশলার ঝাল ঝাল স্বাদের খিচুড়ি সত্যি অসাধারণ লেগেছে। একেবারে গ্রামীণ স্বাদের সুস্বাদু খিচুড়ি। স্বাদ, দাম, পরিবেশ মিলিয়ে ১০/১০ দিবো। খিচুড়ির সাথে সালাদ, লেবু, কাঁচামরিচ এর পরিবেশনায় কার্পণ্য ছিলো না। সাথে নিয়েছিলাম ঠান্ডা মাউন্টেইন ডিউ। কয়েক চামচ ঝাল ঝাল গরম খিচুড়ি খাওয়া শেষে পাণীয়র মিষ্টি ঠান্ডা স্বাদ যেন প্রভাবকের কাজ করছিলো।
কারওয়ান বাজারের মতো কর্মব্যস্ত এলাকায় এমন একটি খাবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি সকালের খাবার নয়, বরং দিনের শুরুতে পরিচিত স্বাদের এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন খাবারের আগমন ঘটলেও ল্যাটকা খিচুড়ির জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং এর স্বাদ ও ঐতিহ্যই একে নগর জীবনের ব্যস্ত মানুষের কাছে আরও বেশি প্রিয় করে তুলেছে।
ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে এই ল্যাটকা খিচুড়ি এখন এক বিশেষ পরিচয়ের নাম। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নেওয়া এই খাবার প্রমাণ করে, কখনও কখনও সাধারণ উপকরণ দিয়েও অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করা সম্ভব।


No comments