"Ruud Gullit" - এক "প্রাক্তন" এর নাম। বিশ্বকাপ ফটবল এর স্মৃতিরোমন্থন
২০২৬ সাল, চলছে "দ্যা গ্রেটেস্ট শো অফ দ্যা আর্থ" বিশ্বকাপ ফুটবল এর জমজমাট আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণ। কর্পোরেট ব্যস্ততার এই মধ্যবয়স পেরুনো জীবনে সময়ের অবসর এর বড্ড অভাব। তাইতো, দু'চারটি ম্যাচ, যা রাত ১০/১১টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোর প্রথমার্ধ দেখেছি। ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ আর তৃতীয় ম্যাচ ভোর রাত ৪টায় উঠে দেখেছি, খেলা শেষে সরাসরি অফিসের জন্য তৈরী হতে হয়েছে। অথচ একটা সময় ছিলো তারুণ্য আর যৌবনে, যখন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে কম পাগলামী করিনি। সেইসব স্মৃতিগুলো আজও হৃদয়ের বন্দরে দোলা দিয়ে যায়। হায় আমার হারানো জীবন...
১৯৯০ সাল, তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। তখন ছিলো ভিউকার্ড এর তুমুল জনপ্রিয়তা। সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, স্পাইডার ম্যান, ব্রুসলি, কমান্ডো এদের ভিউকার্ড এর পাশাপাশি জনপ্রিয় ছিলো তখন ফুটবলারদের ভিউকার্ড যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলো ১৯৯০ এর বিশ্বকাপে শিলাচি, ম্যাথিউস, রজার মিলা, গোয়াকোচিয়ো, ক্লিন্সম্যান, লিনেকার আর সবার সেরা ম্যারাডোনা, যে কি না ১৯৮৬ সালের ঠিক আগের বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলো আর্জেন্টিনাকে। সারা বিশ্ব তখন ম্যারাডোনায় বুঁদ। আর আমার পছন্দের তালিকায় এদের সবাইকে ছাপিয়ে জায়গা করে নিলো কোঁকড়া ঝাঁকড়া চুলের শ্যাম বর্ণের কমলা রঙের জার্সি নাম্বার ১০ এর রুড খুলিত!!!
স্কুলে বসে বসে খাতায় তাকে নিয়ে লিখলাম এক কবিতা। বাসায় একদিন প্রতিবেশী এক চাচী সেই কবিতা দেখে মুখ ভেংচি দিলেন, কারণ তার প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন ম্যারাডোনা। আর শৈশবে আমার অন্যতম প্রিয় ছিলেন সেই প্রতিবেশী চাচী। তাকে খুশী করতে ঠিক সেদিনই ম্যারাডোনা'কে নিয়ে লিখলাম এক কবিতা। কবিতার প্রথম চারটি লাইন এখনো মনে আছেঃ
"ম্যারাডোনা, ম্যারাডোনা, ও ম্যারাডোনা,
তোমার দেশের নামটি আর্জেন্টিনা।
খেলো তুমি কত সুন্দর,
তাইতো জয় করেছো আমাদের অন্তর।"
কিন্তু মজার ব্যাপার ম্যারাডোনা কখনো আমার পছন্দের খেলোয়াড় হিসেবে জায়গা পায় নাই মনের মাঝে। বরং প্রথম ফুটবল প্রেম গড়েছিলো রুড খুলিত'কে কেন্দ্র করে হল্যান্ড জাতীয় দলের প্রতি। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে মনের পরিবর্তন হয়। ১৯৯৪ সালের রোমারিও-বেবেত'র ব্রাজিল দল কিভাবে যেন আমাকে তাদের "ডাইহার্ড ফ্যান" বানিয়ে ফেললো। শৈশব, তারুণ্য আর যৌবনের শুরুতে নিজের প্রিয় দল ব্রাজিলকে দেখলাম পরপর তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে, যার মধ্যে দু'বার বিশ্বকাপ জিতলো, ১৯৯৮ সালে রোনালদো নাজারিও (টাকলু 😜)'র অজ্ঞাত এক অসুস্থতায় হেরে গেলো ফাইনালে। তবে ২০২২ এর বিশ্বকাপ ভুলিয়ে দিয়েছিলো সকল হতাশা। রোনালো, রিভালদো, রোনালদিনহো, রবার্তো কার্লোস, কাফু, দিদা একঝাঁক অসাধারণ প্রতিভার ফুটবলার এর নান্দনিক যাদুতে বুঁদ হয়ে সারা বিশ্ব দেখলো ব্রাজিল এর পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ জয়।
এরপর হতে ফিকে হতে শুরু হল ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের, তারকা ফুটবলারদের যাত্রা। কাকা, নেইমার ছাড়া বিশ্বমানের আলোচিত খেলোয়াড় তেমন দেখেছি বলে মনে পড়ে না ব্রাজিল দলে। বর্তমানে ভিনি জুনিয়র ছেলেটা ভালো খেলছে।
যে কথায় ছিলাম। প্রতিবার বিশ্বকাপ ফুটবল আসলেই কিন্তু "প্রথম প্রেমের মতো, প্রথম পছন্দ এসে বলে...", হ্যাঁ হল্যান্ড দলের কথাই বলছিলাম। মনের গোপনে হল্যান্ড দলের জন্য অনুভূতি জন্ম নেয়, আশা থাকে জিতুক হল্যান্ড। ২০০২ সালে কোয়ালিফাই করলো না তারা, অবাক হয়েছিলাম। এরপর দাপুটে প্রত্যাবর্তন এর গল্প শুরু। ২০১৬ সালে রাউন্ড অফ সিক্সটিন পার হতে না পারলেও ২০১০ এর বিশ্বকাপ কাঁপিয়ে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে থেমে যায় আরিয়েন রোবেন, ওয়েসলি স্নাইডার, রবিন ভন পার্সি'দের জয়যাত্রা। ভাগ্য হতাশ করে পরের বছর ২০১৪ সালেও, সেমিফাইনাল হেরে তৃতীয় পজিশন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। এরপরের বছর সবাইকে হতাশ করে দিয়ে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারে নাই প্রিয় দলটি।!!!
যাই হোক প্রতিবার বিশ্বকাপ ফুটবল আসলে মনের গোপনঘরে হল্যান্ড দলটির জন্য অনুভূতিরা নাড়া দিয়ে যায় যার গোড়াপত্তন হয়েছিলো গোঁফওয়ালা শ্যামবর্ণের রুড গুলিত নামের জাদুকর খেলোয়াড়ের জন্য। রুড গুলিত'কে নিয়ে লেখা কবিতাটির একটি লাইনও মনে নাই। ম্যারাডোনাকে নিয়ে লেখা কবিতার প্রথম চার লাইন মনে থাকার কারন, মেজো মামা পরবর্তীতে কবিতাটি একটা জাতীয় পত্রিকায় ছাপার জন্য দিয়েছিলেন এবং তা ছাপা হয়েছিল। যদিও তার কোন কপি সংগ্রহে নাই।
বিশ্বকাপ ফুটবল এখন আর উপভোগ করা হয় না। বর্তমানে খেলা ভালো লাগে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানী দলের। কদাচিৎ সুযোগ হলে খেলা দেখি। ব্রাজিল দলের ডাইহার্ড ফ্যান ছিলাম বলেই কি না, এবার নিজেকে অবাক করে ভোর রাতে ঘুম থেকে উঠে দুটো ম্যাচ দেখে ফেলেছি। আমি অবাক হয়ে যাই, আমাকে দেখে... প্রয়াত হাসান আবিদূর রেজা জুয়েল এর প্রিয় গানটির কথা মনে পড়ে গেল...

No comments