Header Ads

Header ADS

কস্টনীড়: সব পরিবারেই কিছু ঘর থাকে, যেখানে আলো জ্বলে না (মুভি রিভিউ)

বহুদিন পর চাকুরীরত অবস্থায় ৬ দিনের লম্বা ছুটি পেয়েও বাসায় বসে কাটাচ্ছি পুরোটা সময়। বয়স হলে বুঝি এভাবেই মানুষ বদলে যায়, বদলে যায় তার ভেতরের আমিটা... ধীরে ধীরে, অথবা একলহমায়... যাই হোক ঈদের দিন মাইজিপি থেকে ১মাসের ওটিটি সাবস্ক্রিপশন নিয়েছিলাম চরকি, হইচই সহ আরও তিনটা প্ল্যাটফর্মের। অনলাইনে নামডাক শোনা কিছু কন্টেন্ট দেখলামঃ বনলতা এক্সপ্রেস, দম, উৎসব, ৩৬-২৪-৩৬, ভূতপূর্ব, চক্কর সহ আরও অনেকগুলো দেখলাম, ভ্রমণহীন এই অলস কিন্তু অফুরন্ত সময়টুকুতে। আজ শেষদিন শেষ দেখা কন্টেন্ট "কস্টনীড়", যা আসলে হৃদয়ে দাগ কাটতে পেরেছে। আশফাক নিপুন এর ২০২১ সালের এই নির্মাণ এতদিন কেন দেখা হয় নাই, তা ভেবে অবাক হয়েছি। আর রুনা খান এর নাম অনলাইনে অনেক শুনলেও তার অভিনয় প্রথম দেখলাম, এতো জীবন্ত এবং সাবলীল অভিনয়, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। 

তো শুরু করা যাক রিভিউনামাঃ

অনেকদিন পর এমন একটা বাংলা ওয়েব ফিল্ম দেখলাম, যেটা দেখার সময় বারবার মনে হয়েছে—এই গল্পটা আমি কোথাও দেখেছি। পর্দায় না, জীবনে। আমাদের সমাজে পরিবার মানে আমরা সাধারণত কী বুঝি? একটা ডাইনিং টেবিল, একটা পারিবারিক ছবি, ঈদে বা পারিবারিক কোন উৎসবের দিন একসাথে তোলা হাসিমুখের কয়েকটা ফ্রেম... কিন্তু সেই ছবির বাইরে? সেখানে অনেক পরিবার আছে, যারা একই ছাদের নিচে থেকেও আসলে বহু বছর ধরে আলাদা আলাদা জীবন যাপন করে।

আশফাক নিপুনের "কস্টনীড়" ঠিক সেই জায়গাটাতেই আঘাত করে। মজার ব্যাপারে একই পরিবারের তিন ভাইয়ের তিন ভিন্ন চিন্তার জগতে চরম বাম, ডান পন্থার সাথে ক্যাপিটালিজম'কে চিত্রায়ণ ভাবনা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মুগ্ধ করেছে।

গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ। রাশনার বিয়ে উপলক্ষে বহুদিন পর পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, এই পরিবারের ভেতরে অনেক অমীমাংসিত হিসাব পড়ে আছে। এমন কিছু কথা আছে যেগুলো কেউ উচ্চারণ করে না, কিন্তু সবাই জানে। এবং মানুষ যখন দীর্ঘদিন পর একসাথে হয়, তখন শুধু মানুষ না, স্মৃতিগুলোও ফিরে আসে। পুরোনো ক্ষোভ ফিরে আসে। অভিমান ফিরে আসে, অন্যায় ফিরে আসে।

কস্টনীড়ের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর সংলাপ না, এর নীরবতা।

এই মুভিতে অনেক মুহূর্ত আছে যেখানে কেউ কিছু বলছে না, অথচ মনে হচ্ছে ঘরের বাতাস পর্যন্ত কথা বলছে। একটা পরিবারের সদস্যদের মাঝে যে অস্বস্তিকর দূরত্ব তৈরি হয়, সেটাকে নিপুন খুব সচেতনভাবে দেখিয়েছেন। কোনো মেলোড্রামা ছাড়া, কোনো অতিরঞ্জন ছাড়া।

আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে মুভিটা কোনো পক্ষ নেয় না। বাংলা নাটক বা সিনেমায় আমরা প্রায়ই একজন ভিলেন খুঁজি। একজন অপরাধী খুঁজি। কিন্তু বাস্তব পরিবারগুলোতে বিষয়টা এত সরল না। সেখানে সবাই কিছুটা দোষী। আবার সবাই কিছুটা ভুক্তভোগীও। কস্টনীড় সেই ধূসর জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকে।

তরিক আনাম খানকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের পিতৃতান্ত্রিক কেন্দ্রবিন্দুগুলো এমনই। তারা হয়তো সংসার গড়ে, সন্তান মানুষ করে। কিন্তু কখনো কখনো অজান্তেই এমন কিছু দেয়াল তৈরি করে ফেলে, যেগুলো পরে নিজেরাই ভাঙতে পারে না।

রুনা খান বরাবরের মতোই ভয়ংকর রকম স্বাভাবিক। অভিনয় করছেন বলে মনে হয় না। মনে হয় তিনি এমনই একটি পরিবারের একজন সদস্য। তার অভিনয় নিয়ে শুরুতেই বলেছি।

সাবিলা নূর, ইয়াশ রোহান, শ্যামল মাওলা—প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গা থেকে গল্পটাকে বাস্তব রেখেছে। কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। এবং সম্ভবত এই কারণেই পুরো পরিবারটাকে সত্যিকারের পরিবার মনে হয়েছে।

কস্টনীড় দেখতে দেখতে আমার বারবার মনে হয়েছে, আমাদের সমাজে পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে অনেকটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো ভাবা হয়। শৈশবে বাবা-মা জমা রাখে কর্তৃত্ব, সন্তান জমা রাখে ভয়; পরে বড় হয়ে সবাই জমা রাখে অভিমান। কিন্তু কেউ ভালোবাসার হিসাব আপডেট করে না। একসময় ব্যালেন্স শূন্য হয়ে যায়। তবুও সম্পর্কটা কাগজে-কলমে টিকে থাকে। কস্টনীড় সেই শূন্য ব্যালেন্সের গল্প।

মুভির শেষদিকে এসে যখন পারিবারিক গোপন ক্ষতগুলো একটু একটু করে উন্মুক্ত হতে থাকে, তখন মনে হয়েছে—কিছু সত্য এতদিন চাপা পড়ে থাকে না কারণ মানুষ ভুলে যায়। বরং মানুষ জানে, সত্যটা বের হয়ে এলে পুরো কাঠামোটা কেঁপে উঠবে। তাই সবাই চুপ থাকে। বাংলাদেশি পরিবারগুলোর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষা সম্ভবত বাংলা না। নীরবতা। এই মুভি সেই ভাষাতেই কথা বলে।

তবে কস্টনীড় সবার ভালো লাগবে না। যারা দ্রুতগতির গল্প খোঁজেন, টুইস্ট খোঁজেন, বা প্রতি দশ মিনিটে বড় কোনো ঘটনা দেখতে চান, তাদের কাছে হয়তো ধীর মনে হতে পারে। কারণ এই মুভি ঘটনা দিয়ে না, মানুষ দিয়ে এগোয়। এখানে বিস্ফোরণ নেই, এখানে মানুষের ভেতরের ফাটল আছে। আর সেই ফাটলের শব্দ সবসময় জোরে শোনা যায় না, কখনো কখনো খুব আস্তে শোনা যায়; কিন্তু অনেক গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

মুভি শেষ হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার সম্ভবত ঘর হারানো না। বরং ঘর থাকা সত্ত্বেও সেখানে নিজের জায়গা হারিয়ে ফেলা। হয়তো এই কারণেই নামটা কস্টনীড়। নীড় আছে, মানুষও আছে; কিন্তু শান্তি নেই। স্মৃতি আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। আর সেই অভাবের নামই হয়তো কষ্ট। আশফাক নিপুন খুব বড় কোনো বক্তব্য দেননি। তিনি শুধু একটা পরিবারের দরজা খুলে দিয়েছেন। বাকি কাজটা দর্শকের। কারণ কস্টনীড় দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই মনে হতে পারে— এটা আসলে তাদের গল্প না; আমাদের গল্প।

==========================================

কষ্টনীড় (২০২১)

IMDb: 7.6/10

পরিচালক: আশফাক নিপুন

প্ল্যাটফর্ম: হইচই

অভিনয়ে: তারিক আনাম খান, রুনা খান, সাঈদ বাবু, শ্যামল মাওলা, সাবিলা নূর ও ইয়াশ রোহান।

No comments

Powered by Blogger.