পুরাতন ঢাকার বিকেলের নাস্তা - ১ম পর্ব (আলুপুরি, ডালপুরি, কিমাপুরি) - পুরি
পুরাতন ঢাকার পুরি
পুরান ঢাকা মানেই খাবারের গল্প, আর সেই গল্পের শুরু অনেক সময়ই হয় বিকেলের গরম তেলের হাঁড়ি থেকে। চকবাজার, বংশাল, শাঁখারীবাজার বা নবাবপুর—যেখানেই যান না কেন, বিকেলের দিকে ভেসে আসা একটা চেনা গন্ধ বলে দেয়, পুরি নামছে। তবে পুরান ঢাকার পুরি মানে শুধু এক ধরনের খাবার নয়। এখানে পুরি মানেই আলুপুরি, ডালপুরি আর কিমাপুরি—তিনটি আলাদা চরিত্র, তিন রকম স্বাদ, কিন্তু একটাই ঐতিহ্য। পুরির সঙ্গে পুরাতন ঢাকার সম্পর্ক
বহু আগে থেকে। ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরি এখানে নাস্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরি বদলেছে, ভেতরের পুর বদলেছে, কিন্তু বিকেলের নাস্তা হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা একচুলও কমেনি। এই শহরে পুরি মানে শুধু পেট ভরানো নয়—এটা আড্ডা, বিরতি আর দৈনন্দিন জীবনের এক অনিবার্য অনুষঙ্গ।
আলুপুরি: সবার প্রথম ভালোবাসা
আলুপুরি পুরান ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় পুরি। ময়দার খোলের ভেতরে থাকে মশলা দেওয়া সেদ্ধ আলুর পুর—জিরা, ধনে, শুকনা মরিচ আর কখনো সামান্য গরম মসলার ছোঁয়া।
তৈরির প্রক্রিয়া:
প্রথমে আলু সেদ্ধ করে ভর্তা বানানো হয়, এরপর মশলা মিশিয়ে শুকনো পুর তৈরি করা হয়। আলাদা করে ময়দা, সামান্য লবণ ও তেল দিয়ে খামির তৈরি করে ছোট ছোট লেচি বানানো হয়। সেই লেচির ভেতরে আলুর পুর ঢুকিয়ে গোল করে বেলে গরম তেলে ভাজা হয়। সঠিক তাপে ভাজা হলে পুরি ফুলে ওঠে এবং বাইরে হয় মচমচে, ভেতরে নরম।
স্বাদ:
আলুপুরির স্বাদ ভারসাম্যপূর্ণ—না খুব ঝাল, না খুব হালকা। সাধারণত এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় সাদা ছোলার তরকারি বা পাতলা আলুর ঝোল। এই কম্বিনেশনটাই আলুপুরির আসল শক্তি।
ডালপুরি: সহজ কিন্তু গভীর
ডালপুরি তুলনামূলকভাবে একটু কম ঝলমলে, কিন্তু পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতিতে এর জায়গা খুবই দৃঢ়। এখানে সাধারণত মসুর বা মটর ডাল ব্যবহার করা হয়।
তৈরির প্রক্রিয়া:
ডাল ভিজিয়ে বেটে নিয়ে তাতে লবণ, কাঁচামরিচ ও সামান্য মশলা মেশানো হয়। এই ডাল রান্না করে ঘন পুর বানানো হয়। পরে সেই পুর ময়দার খোলের ভেতরে দিয়ে পুরির মতো করে ভাজা হয়।
স্বাদ:
ডালপুরির স্বাদ একটু সাদামাটা, কিন্তু তৃপ্তিকর। তেলে ভাজার পর ডালের ঘ্রাণ আলাদা করে বোঝা যায়। যাদের অতিরিক্ত ঝাল বা ভারী খাবার পছন্দ নয়, তাদের কাছে ডালপুরি নিঃসন্দেহে প্রথম পছন্দ।
কিমাপুরি: আভিজাত্যের ছোঁয়া
কিমাপুরি পুরান ঢাকার পুরির মধ্যে সবচেয়ে রাজকীয় বলা যায়। সাধারণত গরু বা খাসির কিমা দিয়ে তৈরি এই পুরি একটু দামি, আবার একটু বিশেষও।
তৈরির প্রক্রিয়া:
কিমা প্রথমে পেঁয়াজ, আদা-রসুন, জিরা, গরম মসলা দিয়ে ভালোভাবে কষানো হয়, যাতে ভেতরের পুর শুকনো কিন্তু সুগন্ধি থাকে। এরপর সেই কিমা ময়দার ভেতরে ভরে পুরি তৈরি করে তেলে ভাজা হয়।
স্বাদ:
কিমাপুরির স্বাদ গভীর ও সমৃদ্ধ। এক কামড়েই বোঝা যায় মসলার ভারসাম্য আর মাংসের রসাল ভাব। সাধারণত এটি আলাদা কোনো ঝোল ছাড়াও খাওয়া যায়, তবে অনেক জায়গায় হালকা ডাল বা সালাদ দেওয়া হয়।

No comments