ঢাকার মিষ্টি, তাহাদের সৃষ্টি!!!!
বর্তমানে টিকে থাকা ঢাকার মিষ্টির দোকানগুলোর মধ্যে সবচাইতে পুরাতন মিষ্টির দোকান হল “আলাউদ্দিন সুইটমিট”। আলাউদ্দিন হালওয়াই নামক এক ব্যক্তি ভারতের লখনোউ থেকে পুরান ঢাকার চকবাজারে এসে ১৮৬৪ সালে গোড়াপত্তন করেন এই মিষ্টির দোকানের। ১৮৬৪ সালে তিনি লখনোউ থেকে ঢাকার চকবাজারে এসে একটি মিষ্টির দোকান খুলেন এবং পরবর্তীতে তার এই মিষ্টান্ন ব্যবসা সফলতা লাভ করার পরে আলাউদ্দিন তার ব্যবসা সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং সেই সূত্রধরেই ১৮৯৪ সালে তিনি দোকানটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন "আলাউদ্দিন সুইটমিট"। অনেক ইতিহাসবেত্তার মতে আধুনিক ঢাকার মিষ্টির আদি কারিগর এই আলাউদ্দিন হালওয়াই যার হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় আধুনিক ঢাকার মিষ্টির জগতের এক শতকের বেশী সময়ের যাত্রা। চার প্রজন্মের বেশী সময় ধরে তারা সুনামের সাথে করে যাচ্ছে এই মিষ্টান্নের ব্যবসাটি। বর্তমানে চকবাজারে দুটি শাখা সহ ঢাকার নিউ মার্কেট, গ্রিন রোড, মৌচাক, সিদ্ধেশ্বরী, বিমানবন্দর, চানখাঁরপুল, মহাখালী, সিক্কাটুলী, নবাবপুর, নারিন্দা, কদমতলি এবং নয়াবাজার এ রয়েছে তাদের দোকানের শাখা। দেশের বাইরে জ্যাকসন হাইটস, নিউ ইয়র্ক, ব্রিকলেন, লন্ডন, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভারতে রয়েছে তাদের শাখা। যদিও তাদের মিষ্টির সেই আদি স্বাদ আর সুনাম এখন অনেকটাই হারিয়েছে, হারিয়েছে জৌলুশ। মাঝে ২০০৫-২০০৯ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো তাদের এই আদি ব্যবসাটি, যা ২০০৯ হতে চতুর্থ প্রজন্মের সদস্যদের দ্বারা আবার পুনরায় যাত্রা শুরু করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আলাউদ্দিনের মিষ্টির চাইতে চকবাজারের বোম্বের মিষ্টি বেশী পছন্দ করি। বকশীবাজার হয়ে উর্দুরোড দিয়ে চকবাজারে ঢুকতেই যে চাররাস্তার মোড়ের জটলা, সেখান থেকে “চকবাজার শাহী মসজিদ” এর রাস্তার শুরুতে হাতের বাম দিকে পেয়ে যাবেন এই দোকানটি। পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় ধরে ব্যবসা করে আসা এই দোকানের মিষ্টির মূল বৈশিষ্ট্য হল দিনে তৈরী হয়ে দিনে শেষ হয়ে যাওয়া; বিশেষ করে এখানকার কাঁচা ছানা সারা ঢাকা শহরের মধ্যে সেরা, সব সময় তা পাওয়াও যায় না। তবে আলাউদ্দিন এবং তারপর বোম্বে সুইটস এর হাত ধরে র্যাপিিং পেপারে মোড়ানো স্পেশাল মিষ্টির বক্স এর যাত্রা, যা পুরাতন ঢাকায় বিয়ে, সুন্নতে খাতনা সহ নানান অনুষ্ঠানের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিলো সত্তর-আশির দশক থেকে। এখনো এই বক্সগুলো পাওয়া যায়, তবে আগের মত জনপ্রিয় নয়। একটা বক্সে আট পিস ভিন্ন ভিন্ন পদের ঢাউস সাইজের মিষ্টি থাকতো এসব বক্সে। আলাউদ্দিন, বোম্বে সুইটস এর গল্প থামিয়ে রেখে ঢাকা শহরের আরেক বিখ্যাত মিষ্টি ত্রয়ী “মরণ চাঁদ”, “মহন চাঁদ” এবং “যাদব ঘোষ” এর কথা বলা যাক। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময় থেকেই ঢাকা শহরের মিষ্টির ব্যবসায় অবদান রাখতে শুরু করে এই তিন হিন্দু ময়রাদের মিষ্টির দোকান। আলাউদ্দিন হালওয়াই এর মুসলিম ঘরনার মিষ্টান্নের পাশে দাপটের সাথে ব্যবসা জমিয়ে বসে ঢাকা শহরে এই তিনটি মিষ্টির ব্র্যান্ড। এর মধ্যে তিন পুরুষের বেশী সময় অতিবাহিত করে ১৪৫ বছরের পুরাতন মিষ্টান্ন ভান্ডার “মরণ চাঁদ” থেকে হয়েছে "মরণ চাঁদ গ্রান্ড সন্স”। একই ঘটনা ঘটেছে বাকী দুই মিষ্টির দোকানের ক্ষেত্রেও, প্রজন্মান্তরে তারাও আজ “মহন চাঁদ গ্রান্ড সন্স” এবং “যাদব ঘোষ এন্ড গ্রান্ড সন্স”। এদের তিনজনের মিষ্টিই ঢাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে ফেলে আসা দিনে। যদিও অধুনা নানান নতুন ব্র্যান্ড এর ভীড়ে এদের অতীতের জৌলুশ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে, কিন্তু ঢাকার আদি বাসিন্দারা আজও কদর করে এই তিন দোকানের মিষ্টির। বিশেষ করে “মরণ চাঁদ” এর কদর রয়েছে ঢাকার অনেক পুরাতন বাসিন্দাদের কাছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রিয় মহন চাঁদ এর দই, ভীষণ প্রিয়। এদের বাইরে মুন্সিগঞ্জ ভিত্তিক দুই মিষ্টির দোকান “ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডার” এবং “বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার” রয়েছে ঢাকাবাসীর পছন্দের তালিকায়। যদিও মূল ভাগ্যকূল বাজারে বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং বিখ্যাত মিষ্টির দোকান রয়েছে যাদের মধ্যে “গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভান্ডার” ও “চিত্তরঞ্জন মিষ্টান্ন ভান্ডার”। ভাগ্যকুল এবং বিক্রমপুর মিষ্টান্ন’র মিষ্টিও স্বাদে-গুণে কোন অংশেই অন্যদের থেকে পিছিয়ে ছিলো না, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এদের মান কিছুটা পরতির দিকে। সরাসরি বিক্রমপুর এর আদি সোর্স হতে সরে গিয়ে ঢাকায় নিজেরা তৈরী পর্যন্ত ঠিক ছিলো, কিন্তু অভিযোগ রয়েছে তারা থার্ড পার্টি থেকেও সোর্সিং করে থাকে। এদের বাইরে পুরাতন ঢাকায় বেশ কিছু স্থানীয় ৫০ বছরের কম-বেশী বয়সী পুরাতন মিষ্টান্নর দোকান রয়েছে যা স্থানীয়ভাবে খুবই জনপ্রিয়। পাটুয়াটুলির “দিল্লি সুইটস”, লালবাগের “মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডার”, নর্থ-সাউথ রোডের “মাজহার সুইটস”, নবাবগঞ্জ-হাজারীবাগ এলাকার “কায়সার সুইটমিট”, সাতরওজা আবুল হাসনাত রোডের “দয়াল ভান্ডার”, নারিন্দার “তানয়ীমস সুইটমিট”, নবাবপুরের গ্রিন সুইটমিট, গেন্ডারিয়ার “সোনামিয়ার মিষ্টি”, মিরপুরের “মুসলিম সুইটস” এর মত মিষ্টির দোকানগুলো। অধুনা জনপ্রিয় হয়েছে যে সকল দোকানগুলো তার মধ্যে চট্টগ্রামের “বনফুল”, জেমকন গ্রুপের “মীনা সুইটস”, “প্রিমিয়াম সুইটস”, “রস”, “খাজানা”, “মিঠাই” সহ নানান উচ্চমূল্যের এবং কোয়ালিটি সম্পন্ন মিষ্টির দোকানগুলোর। স্বাদে এবং আঙ্গিকে ভিন্নতা নিয়ে শতবর্ষের অধিক সময় ধরে ঢাকার মিষ্টি রসনা বিলাস মিটিয়েছে হাজারো ভোজন রসিকদের। আগামীতে ঢাকার বেকারী এবং কনফেকশনারি নিয়ে লেখা থাকছে আমার ব্লগে।
সংগ্রহ সংযোজন:
আদি মরণচাঁদ ঘোষ এন্ড সন্স -------
পুরান ঢাকার অন্যতম আকর্ষণ হলো,আদি মরণচাঁদ এন্ড সন্স। শুধু পুরান ঢাকা বলা ভুল হবে,বর্তমানে পুরো বাংলাদেশের অন্যতম ব্র্যান্ড এই প্রতিষ্ঠান। দেশ বিদেশ মিলিয়ে তাদের শাখার সংখ্যা অনেক। পুরনো দিনের প্রায় হারিয়ে যাওয়া অনেক মিষ্টিই এই দোকানে মিলবে। স্বাদের বিশেষত্ব এখনও আগের মতোই খাঁটি।
নওয়াবপুর রোডের রথখোলায় অবস্থিত এই মিষ্টির দোকানটির বয়স প্রায় ১৫০ বছর। ঢাকার বিখ্যাত মরণচাঁদ ঘোষের পিতা গঙ্গাচরণ ঘোষ (১৮৫০-১৯৬৩) উনিশ শতকের ৬০-এর দশকে নওয়াবপুরে তার ব্যবসা শুরু করেন।
লালচাঁদ মকিম লেনে তিনি একখণ্ড জায়গা কিনতে সক্ষম হন ও পরে নওয়াবপুরে আরও দোকান কেনেন । গঙ্গাচরণ আজকে নওয়াবপুরের রথখোলায় মরণচাঁদ নামের যে মিষ্টির দোকান রয়েছে,সেখানেই প্রথম তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেন। গোড়ার দিকে তাকে উত্তর ভারত থেকে আগত মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারকদের প্রতিযোগিতার পাল্লায় পড়তে হয়।
ঢাকার নওয়াবরা গঙ্গাচরণ ঘোষের দইয়ের খুব ভক্ত ছিলেন। সাধারণ মুসলমানরা তার দোকান থেকে দই কিনতে কিছুটা অনাগ্রহী থাকলেও নওয়াব পরিবারে এর সুখ্যাতি লক্ষ্য করে তারাও গঙ্গাচরণের দই কিনতে শুরু করে। গঙ্গাচরণই প্রথমবারের মতো দইয়ে চিনি যোগ করে এর স্বাদ বাড়ান। তার তিন ছেলে - বিনোদ বিহারী ঘোষ,কেশব চন্দ্র ঘোষ ও মরণচাঁদ ঘোষ ।
জ্যেষ্ঠপুত্র বিনোদ বিহারী ঘোষ ও কনিষ্ঠ পুত্র মরণচাঁদ ঘোষ তার ব্যবসায়ে যোগ দেন। গঙ্গাচরণ প্রধানত দই তৈরিতে নিয়োজিত থাকলেও মরণচাঁদ গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে অন্যান্য মিষ্টান্ন তৈরি করতে শুরু করেন। মরণচাঁদ ঘোষ যখন রথখোলায় দোকান নিয়ে বসতেন,ঢাকা শহরে তখন লোক ছিল অল্প। তবুও হাতের যশ আর স্বাদের গুণে তাঁর মিষ্টান্নের খ্যাতি ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
মরণচাঁদ ঘোষ তার তিন ছেলে সুবোধচন্দ্র ঘোষ,হরিপদ ঘোষ ও শম্বূনাথ ঘোষের সাহায্যে তার ব্যবসা ১৯৬৫ সাল অবধি পরিচালনা করেছিলেন। তাদের পৌত্ররা সম্ভবত তাদের নিজ নিজ একই ব্যবসায় পরিচালনা করছে। আজকের ঢাকা নগরীতে একই ধরনের খ্যাতিসম্পন্ন বহু মিষ্টান্নের দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যাদের মিষ্টান্ন মান ও বৈচিত্রেও উন্নত। মিষ্টান্ন ছাড়াও,
শুধুমাত্র দইয়ের জন্যই মরণচাঁদ খুবই খ্যাতি অর্জন করেন।।
সূত্র : ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাস_________

No comments